লেখা পড়ে ক্ষেপে যাওয়ার আগে ছোট্ট ডিসক্লেইমার:
রোজার নিয়ত বা লক্ষ্য ওজন কমানো না। কোরআন-হাদিসে কোথাও লেখা নেই “ওজন কমাতে রোজা রাখো।” নবী-সাহাবীরাও ওজন কমানোর জন্য রোজা রাখতেন না- সেই সময়ে ওজন কমানো স্বাস্থ্য সমস্যা ছিলো না। এই লেখাটি তাদের জন্য যারা রমজানে রোজা বা সাওম পালন করে আশানুরূপ ওজন হ্রাস দেখতে পান না এবং কারণটি বুঝতে চান। রোজার মূল উদ্দেশ্য ওজন কমা নয়। ওজন কমলে সেটা বোনাস।
রোজায় আমরা কী করি? মাসের শুরুতে ভাবি এই রমজানে ১০ কেজি কমায় ফেলবো। কিন্তু ইফতারের আগে ভাবি: “ আজকের রোজায় ৫ কেজি নামবেই ইনশাআল্লাহ!” তারপর প্লেটে জিলাপি, পিয়াজু, বেগুনি, চপ, শরবত, আবার রাতে ভাত-মাংস, সেহরীতে দুধ-ভাত খেয়ে ঘুমে ফজরের নামাজ ক্বাজা। রমজান শেষে বলি: “রোজা রাখি, তাও ওজন কমে না!”
ওজন কমানোর বিজ্ঞান একটু অন্য কথা বলে। ওজন কমানোর মূল ফর্মুলা: ক্যালরি ডেফিসিট। অর্থাৎ, ওজন কমে যখন: আপনি যত ক্যালরি খান তার চেয়ে বেশি ক্যালরি খরচ করেন।

ছবি ক্যালরি ইন ও ক্যালরি আউট। (ছবির কৃতিত্ব: ফায়ার রেসকিউ ফিটনেস)
- ক্যালরি ইন মানে কত টুকু খাচ্ছেন আর ক্যালরি আউট মানে কতটুকু খরচ করছেন। কতটুকু খাচ্ছেন আর কতটুকু খরচ করছেন তার যোগ-বিয়োগই নির্ধারণ করবে ওজন। লিংক: ফায়ার রেসকিউ ফিটনেস ওয়েবসাইটের Calories In vs. Calories Out for Weight Loss: Written by ZAM.
- ক্যালরি ইন যদি ক্যালরি আউটের চাইতে বেশি হলে ওজন বাড়বে। (খাওয়া বেশি, পরিশ্রম কম)
- ক্যালরি ইন যদি ক্যালরি আউটের চাইতে কম হলে ওজন কমবে। (খাওয়া কম পরিশ্রম বেশি)
ধরেন, খাচ্ছেন ৩০০০ ক্যালরি, খরচ করছেন ২৪০০ ক্যালরি: বাকি ৬০০ জমা হচ্ছে।
কোথায় জমা হচ্ছে? ফ্রিজে না। শরীরে।
রমজানে অনেকের ক্ষেত্রে এই অভ্যাস:
-দিনে না খেলেও ইফতারে “বাপের বড় পোলায় খায় বা স্টারের কাবাব”
-সেহরিতে “বেশি খেয়ে নেওয়া যদি রোজায় ধরে”
-কম হাঁটা, কম কাজ (রোজায় কি বেশি কাজ করা যায়)
-দুপুরে ঘুম বা বিশ্রাম
ফলাফল: খাবারের টাইমিং বদলায়। মোট ক্যালরি ইনপুট কমে না। ওজনও কমে না। কারণ মোট ক্যালরি ইনের পরিমাণ ক্যালরি আউটের চাইতে বেশি। রমজানে অনেকের গড়ে সামান্য ওজন কমে (প্রায় ১–১.৫ কেজি)। কিন্তু রমজান শেষে দ্রুতই অনেকটা ফিরে আসে।
রোজাকে ধরে নিতে পারেন ড্রাই ফাস্টিং। উপকারিতা আছে? আছে। কিন্তু… রমজানের রোজা হলো dawn-to-dusk dry fasting (খাবার + পানি বন্ধ)।
সম্ভাব্য উপকারিতা:
-কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ওজন কমতে পারে। যারা তাদের কাজকর্ম ও পরিশ্রম রমজান পূর্ববর্তী সময়ের মতোই রাখেন এবং পরিমিত খান
-কিছু metabolic marker সামান্য উন্নত হতে পারে (সাধারণ ফাস্টিংয়ে সাধারণত এজিং এর মার্কার গুলোর উন্নতি দেখা যায়)
-সময়সীমাবদ্ধ খাওয়ার ফলে ইনসুলিন সেনসিটিভিটি কিছু ক্ষেত্রে ভালো হতে পারে (ডায়বেটিস)
অটোফেজি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলাপ (পড়তে চাইলে ক্লিক করুন)
অটোফেজি নিয়ে অনেকেই বলেন: “ড্রাই ফাস্টিং অটোফেজি বাড়ায়।” বাস্তবতা:
-প্রাণী ও কোষ গবেষণায় ফাস্টিং অটোফেজি সক্রিয় করতে পারে — ঠিক। (সায়েন্টিফিক রিপোর্ট জার্নালে ইঁদুরের উপর গবেষণা আছে)
-কিন্তু মানুষের রমজানধর্মী ড্রাই ফাস্টিংয়ে নির্দিষ্টভাবে কতটা, কত সময়, কোন টিস্যুতে—এ নিয়ে পরিষ্কার ও কনসিসটেন্ট ডেটা এখনও সীমিত। (লো ইমপ্যাক্টের জার্নালের গবেষণায় কিছু মার্কার উন্নতি দেখা গিয়েছে কিন্ত স্যাম্পল সাইজ ছোট)। [যতদূর আমি পড়েছি ও দেখেছি- হয়তো আমার অজানা গবেষণা রয়েছে]
সুতরাং অটোফেজি “হতে পারে”, কিন্তু “প্রমাণিত ম্যাজিক” না। অটোফ্যাজি জার্নালের একটি গবেষণায় ইদুরে ২৪-৪৮ ঘণ্টা ফাস্টিং (উপবাস) অটোফেজি চালু হয়। চালু হওয়া আর কার্যকরী (সিগনিফিক্যান্টলি) চালু ভিন্ন তাই ধারণা করতে পারেন “মানুষে” অটোফেজির উপকারিতা পেতে আপনাকে ২৪ ঘন্টার বেশি ফাস্টিং করতে হবে এবং কমপক্ষে ১৬ ঘণ্টা ফাস্টিং করতে হবে শুধু চালু করতে। (ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের লিংক দিলাম) অটোফেজির আলোচনার জন্য ওজন কমানোর দিকে নয় পর কোষের ক্লিনআপ আলাপ প্রযোজ্য।
ড্রাই ফাস্টিংয়ের সম্ভাব্য সমস্যা:
বিশেষ করে গরম দেশ, দীর্ঘ সময়, বা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে: ডিহাইড্রেশন (পানিশূন্যতা), মাথা ঝিমঝিম বা ঘোরা, কোষ্ঠকাঠিন্য, কিডনির উপর চাপ (বিশেষ করে CKD রোগীদের ক্ষেত্রে)। কিডনি রোগী, ডায়াবেটিস, গর্ভবতী নারী, গুরুতর হৃদরোগী- এদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আর হ্যাঁ রোজাদারের “হ্যাংরি” (hungry + angry) ব্যাপারটা বাস্তব। তাই সামনে কেউ পানি খেলেই কেন যেন রাগ উঠে – এটাও ফিজিওলজি + মুড রেগুলেশন। কিন্তু রোজাদার ভুলে যায় যে তার সামনে পানাহার করছে সেটা ঐ ব্যক্তির অধিকার যেমন রোজা রাখাও ব্যক্তির অধিকার।
অন্যদিকে অনেকেই খুব সকালে (ফজরের ওয়াক্তের দিকে) ঘুম থেকে উঠে অভ্যস্ত না। অনেকেই সেহরীর জন্য রাত ২-৩টার দিকে উঠে সেহরী খেয়ে ঘুমায়। অনেকে ১২-১ পর্যন্ত জেগে সেহরী খেয়ে ঘুমায়। কেউবা ১২ টার দিকে ঘুমিয়ে সকাল ৪-৫ টার দিকে সেহরী খেয়ে বাকিসময় ফোনালাপ বা ফোন বা ল্যাপটপে সময় কাটায়। দৈনিক ৭-৯ ঘন্টা ঘুম জরুরী- টানা ঘুম হলে ভালো। কম ঘুম বা ঘুমের ব্যাঘাত
তাহলে কাদের ওজন কমে? যারা:
১. রোজা রেখেও কায়িক পরিশ্রম করে
২. অতিরিক্ত ইফতার পার্টি করে না
৩. হাই-ক্যালরি ডিপ ফ্রাই খাবার কম খায়
৪. খেলাধূলা বা ব্যায়ামের কারণে যাদের মাসল বা পেশী বেশী
রিকশাচালক, দিন মজুর, শারীরিক শ্রমজীবী মানুষের ওজন কমার সম্ভাবনা বেশি- কারণ তারা ক্যালরি ডেফিসিটে থাকে।রোজায় স্বাস্থ্য ভালো রাখতে চাইলে ধর্মীয় উদ্দেশ্য ঠিক রেখেই কিছু বাস্তব কথা:
-ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পানি ভাগ করে পান করুন
-“ডোজ” কমান, সব বাদ না – পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ
-প্রোটিন + ফাইবার বাড়ান (মাংস- শাকসবজি)
-ইফতারের ১–২ ঘন্টা পর হালকা হাঁটা (১০-১৫ মিনিট)
-সেহরি খেয়ে সাথে সাথে ঘুম না
– পর্যাপ্ত ঘুম ও ব্যায়াম করুন
রোজার শিক্ষা সংযম। রোজায় সংযমের শিক্ষা দেয় শুধু দিনের বেলা নয়, শুধু রমজান মাস নয়- বরং পুরো বছরের সংযমের ট্রেনিং। সংযম হারালে বিজ্ঞানও আপনাকে বাঁচাতে পারবে না।
শেষ কথা: রোজা = ওজন কমবে- এই সমীকরণ ভুল। রোজা = আত্মসংযম।
ওজন কমা নির্ভর করে আপনার ক্যালরি ব্যালান্স, কাজকর্ম, ঘুম ও খাদ্যাভ্যাসের উপর। আপনি সারাদিন রোজা রেখে ইফতারে হামলে পড়ে খাবার খেলে রোজার সংযমে শিক্ষার বরখেলাপ হয় আমি মনে করি- একইসাথে স্বাস্থ্যগতভাবে শরীরকে খারাপে দিকে নিয়ে যাচ্ছেন।
ওজন না কমানোর দোষ রোজার ওপর না দিয়ে আপনার ইফতারের প্লেটের উপর দোষ দিন।
যারা বিজ্ঞানের ব্যাপারে হতে পারে যুক্তিতে প্রমাণ ব্যতীত দাবি করেন।
আর বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে “হতে পারে বা এটার মানে ঐটা, ঐটা মানে সেটা ” বলে মিল খোঁজা বিজ্ঞান নয় বরং শুধু্ই দাবি যা প্রমাণ করতে হবে। প্রমাণের ক্ষেত্রে কোন দাবিগুলো প্রমাণিত আর কোনগুলো নয় সেটাও জরুরী। আপনি যদি আগেই কোন কিছুকে সত্য বলে ধরে নিন বা সেই দাবি প্রমাণের জন্য তথ্য খুঁজতে শুরু করেন তবে আপনি “বায়াসে” আক্রান্ত- এটি সঠিক বিজ্ঞান নয়। সঠিক বিজ্ঞানে উপকারিতা-অপকারিতা, সঠিক দাবি- ভুল দাবি মেনে নিতে হবে, বলতে হবে।
নিচে কিছু রেফারেন্স দিলাম- মানুষের উপর পরীক্ষা বা মানুষের ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করা রিভিউ বা লিংক- সহজপাঠ্য।
রেফারেন্স বা উৎস:
১. রমজানে ওজন কমার রিভিউ গবেষণা : (সতর্কতা: এমডিপিআই জার্নাল- প্রিডেটরী) https://www.mdpi.com/2072-6643/11/2/478
২. রোজায় রক্তে গ্লুকোজ ও ফ্যাট কন্টেন্টের রিভিউ গবেষণা : (সতর্কতা: এমডিপিআই জার্নাল- প্রিডেটরী): https://www.mdpi.com/2072-6643/12/8/2478
৩. রমজানে কিডনী রোগীদের (CKD) ক্ষেত্রে সতর্কতা ও ডাক্তারের পরামর্শ নিবার রিভিউ গবেষণা: https://pmc.ncbi.nlm.nih.gov/articles/PMC6859673
৪. ড্রাই ফাস্টিং এর মিথ, দাবি ও জানা অজানা: https://health.clevelandclinic.org/dry-fasting
৫. ২০২৫ এর গবেষণা যেখানে ২০ ঘন্টা ফাস্টিংয়ে অটোফেজির প্রভাব দেখা হয়: https://physoc.onlinelibrary.wiley.com/…/10.1113/JP287938
৬. ঘুম এবং ওজনহ্রাসের সম্পর্ক- কোষের মেটাবলিজম, হরমোন ও খাবারে আগ্রহ
https://www.sleepfoundation.org/physical-health/weight-loss-and-sleep
ছবির লিংক বা উৎস: ছবি: সহজ ছবি দিলাম। এইখানের লেখা সহজে বুঝতে পারবেন। লিংক: রেসকিউ ওয়েবসাইটের Calories In vs. Calories Out for Weight Loss: Written by ZAM. https://firerescuefitness.com/2023/04/calories-in-calories-out-for-fat-loss/
কভার ছবি: চ্যাটজিপিটির সহায়তায় তৈরি।
মূল লেখা: লেখকের নিজের। বিষয়টি সাধারণ পাঠকের জন্য সহজবোধ্য ভাষায় উপস্থাপন করতে কিছু ক্ষেত্রে চ্যাটজিপিটির সহায়তা নেওয়া হয়েছে। এক চিমটি বিজ্ঞানের উদ্দেশ্যই হলো-বিজ্ঞানের বিষয়গুলোকে জটিল গবেষণাগারের ভাষা থেকে বের করে সাধারণ মানুষের ভাষায় ব্যাখ্যা করা।
লেখাটি Siam Sayeed (জনাব সিয়াম সায়িদ) কে উৎসর্গ করা হলো, যিনি আমার”এক চিমটি বিজ্ঞান” লেখা মিস করেন জানান। যেহেতু উনার নামের প্রথম অংশ সিয়াম তাই রোজা নিয়ে লিখা।
