সুকুমারের “বিষম” প্রশ্নগুলোর জবাব

সুকুমার রায়।

ছোট্টবেলা থেকে এই লোকটা ক্রমাগত আনন্দ দিয়ে এসেছে। সুকুমারের কবিতাগুলো, গল্পগুলো, প্রবন্ধগুলো, নাটিকাগুলো বারবার পড়ি। তাকে সবাই “আবোল তাবোল”, “হ য ব র ল” ইত্যাদি ননসেন্স রাইমের জন্যই বেশি চেনে। এগুলোর মধ্যেই একটা দারুণ কবিতা আছে, যেখানে সুকুমার বিজ্ঞানীদের মতো প্রশ্ন করেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, কেউ তার সেসব প্রশ্নের জবাবই দিচ্ছে না! এই নিয়ে তার আফসোসের শেষ নেই। কবিতাটা পড়ে ছোট্টবেলাতেও অনেক ভেবেছি। আসলেই তো! এমন প্রশ্নগুলোর কেউ জবাব দেয় না। উল্টো জিজ্ঞেস করলে বকে দেয়। বলে, বড়ো হলে জানতে পারবো। কিন্তু অমন বকা খেয়ে বড়ো হয়ে আমরা প্রশ্ন করার সাহস আর ইচ্ছাটাও হারিয়ে ফেলি। উত্তরও জানা হয় না।

আজ ভাবলাম আর কিছু না হোক, সুকুমারের সেই প্রশ্নগুলোর অন্তত উত্তর দেই। সময় পেলে অন্যান্য প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজে নেয়া যাবে’খন!
প্রথমেই কবিতাটা…

বিষম চিন্তা

মাথায় কত প্রশ্ন আসে, দিচ্ছে না কেউ জবাব তার –
সবাই বলে, ”মিথ্যে বাজে বকিসনে আর খবরদার!”
অমন ধারা ধমক দিলে কেমন করে শিখব সব?
বলবে সবাই ”মুখ্য ছেলে”, বলবে আমায় ”গো গর্দভ!”
কেউ কি জানে দিনের বেলায় কোথায় পালায় ঘুমের ঘোর?
বর্ষা হলেই ব্যাঙের গলায় কোত্থেকে হয় এমন জোর?
গাধার কেন শিং থাকে না, হাতির কেন পালক নেই?
গরম তেলে ফোড়ন দিলে লাফায় কেন তা ধেই ধেই?
সোডার বোতল খুললে কেন ফসফসিয়ে রাগ করে?
কেমন করে রাখবে টিকি মাথার যাদের টাক পড়ে?
ভূত যদি না থাকবে তবে কোত্থেকে হয় ভূতের ভয়?
মাথায় যাদের গোল বেঁধেছে তাদের কেন ”পাগোল” কয়?
কতই ভাবি এসব কথার জবাব দেবার মানুষ কই?
বয়স হলে কেতাব খুলে জানতে পাব সমস্তই।

=০=
এবারে এসব প্রশ্নের জবাব…

কেউ কি জানে দিনের বেলায় কোথায় পালায় ঘুমের ঘোর?

দিনের বেলায় জেগে থাকার কয়েকটা কারণ আছে। প্রথমত রাতে ভাল মতো ঘুমালে শরীর চনমনে হয়ে যায়। ক্লান্তি চলে গিয়ে ফুর্তি আর শক্তি আসে। হৃৎপিণ্ড বেশি বেশি রক্ত পাম্প করে। সেই রক্ত মগজে গিয়ে মগজকেও চালু রাখে। তাই ঘুমের সময়ের অলস মগজ তখন সজাগ। তাই ঘুমও দূরে পালায়। এছাড়াও আমরা আলোক-সংবেদী প্রাণী। আলো দেখলে সেনসিটিভ হয়ে যাই আর কি। দিনের আলোতে তাই ঘুমানো কঠিন।

বর্ষা হলেই ব্যাঙের গলায় কোত্থেকে হয় এমন জোর?

বর্ষা কাল হলো ব্যাঙের মিলনঋতু। এজন্য এসময় সে ডাকাডাকি করে। আর তাছাড়াও, পরিবেশটা তার জন্য মনোরম, ঠাণ্ডা, ও আর্দ্র।

গাধার কেন শিং থাকে না

গাধা Equus গণ (genus)-এর প্রাণী। এদের সমগণের অন্য প্রাণীগুলো হলো ঘোড়া, mule, জেব্রা ইত্যাদি। এদের কারোই শিং নেই। গরু, মহিষ বা ছাগলের গণ থেকে এই গণটি সম্পূর্ণ আলাদা। প্রতিপক্ষের হাত থেকে বাঁচার জন্য এদের রয়েছে গতি, তাই তারা দৌড়ে পালায়। শত্রু কাছাকাছি এলে তারা পেছনের পা দিয়ে লাথি মারে। অন্যদিকে শিংওয়ালাদের গতি কম, তাই তারা শিং ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে ঠেকায়।

হাতির কেন পালক নেই?

হাতির এত বড় শরীরের তাপমাত্রাটাকে বাগে রাখতেই পালক ঝরে গেছে। নয়তো ঘামতে ঘামতে বেচারা শেষ হয়ে যেতো।

গরম তেলে ফোড়ন দিলে লাফায় কেন তা ধেই ধেই?

গরম তেলের তাপমাত্রা প্রায় ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি থাকে। এই তাপমাত্রায় ফোড়ন ফুটে যায়। এজন্যই তাপের ধাক্কায় আর ফুটে যাওয়ার আনন্দে সে লাফায়।

সোডার বোতল খুললে কেন ফসফসিয়ে রাগ করে?

সোডা আসলে কার্বোনেটেড পানি। স্বাভাবিক বায়ুচাপের চেয়ে বেশি চাপে ওটাকে বোতলে পোরা হয়। বোতলের মুখ খুলতেই সেই চাপটা সরে যায়। প্রথমের হিসহিস শব্দটা সেই বায়ুচাপের সমতার আওয়াজ। আর চাপ কমে যাওয়া মাত্রই সোডার পানিতে গুলিয়ে রাখা গ্যাসটুকু বেরিয়ে আসার সুযোগ পায়। সেটার বুদবুদের ঠেলা এর পরে দেখা যায়।

কেমন করে রাখবে টিকি মাথার যাদের টাক পড়ে?

এইটা একটা বেদনাদায়ক প্রশ্ন, দাদু। আসলেই কোন উপায় নাই মাথায় চুল টিকিয়ে রাখার। পড়তে শুরু করলে আল্টিমেটলি সব পড়ে যাবে। পারসোনালি আমার মনে হয় সুকুমার দাদুকে বলি, দাদু মন খারাপ কইরেন না। আপনার গুণ এত বেশি বলেই চুল মাথায় থাকলো না। প্রকৃতি ব্যালান্স করছে।

ভূত যদি না থাকবে তবে কোত্থেকে হয় ভূতের ভয়?

ভূতের ভয় আসলে অজানাকে ভয়। আদিকালে মানুষ অন্ধকারকে ভয় পেতো। কারণ অন্ধকারে সে দেখতে পেতো না। আগুনও জ্বালাতে শেখে নি। তখন নিশাচর প্রাণীরা আক্রমণ করলে সে একেবারেই অসহায় আত্মসমর্পণ করতো। তাই আমাদের জিনের মধ্যে সেই ভয়টা ঢুকে গেছে। এজন্য ছোটকাল থেকে সবাই অন্ধকার বা অজানাকে ভূত-টুতের গল্প বলে ভয়ের বস্তু বানিয়ে দেয়। আসল ভয়টা প্রোটেকটিভ ইনস্টিংক্ট।

মাথায় যাদের গোল বেঁধেছে তাদের কেন “পাগোল” কয়?

ওদের ‘পাগোল’ যে কেন কয়? আসলে তো তারা অসুখে ভুগছে। কিন্তু আমরা মূর্খ ছিলাম তাই তাদের অসুখটা চিনতে পারি নাই। হাতে-পায়ে অসুখ হলে চিহ্ন দেখা যায়। মাথায় অসুখ হলে তো চিহ্ন দেখা যায় না, তাই সেটা নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতাম (এখনো করি!) আমরা। এটা ঠিক না। মাথার অসুখও শরীরের অসুখের মতই। চিকিৎসা আছে। চিকিৎসা করলে ঠিক হয়ে যায়।

 

এমন বিতিকিচ্ছিরি প্রশ্ন করার অভ্যাস জারি থাকুক!

Comments

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

1 মন্তব্য on "সুকুমারের “বিষম” প্রশ্নগুলোর জবাব"

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
সাজান:   সবচেয়ে নতুন | সবচেয়ে পুরাতন | সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত
অপরিচিত
অতিথি

হা হা হা…. সুন্দর উত্তর হয়েছে।

wpDiscuz