১৯০৫ সালে বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে আজ অবধি বেশ কিছু সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এরকমই একটি সিদ্ধান্ত হচ্ছে, গতিশীল বস্তুর ভরের আপেক্ষিক পরিবর্তন না হওয়া। বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্বে দৈর্ঘ্য সঙ্কোচন, সময় প্রসারণের সাথে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা হয় – ভরের বৃদ্ধি যেটা হেনড্রিক লরেঞ্জ এর ক্যাথোড রশ্মির পরীক্ষা থেকে সরাসরি গ্রহণ করা হয়েছিল। বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্বে স্থানাঙ্ক কাঠামো রূপান্তর যেহেতু লরেঞ্জ রূপান্তরের ভিত্তিতে হয়ে থাকে, সেহেতু আপেক্ষিকতার প্রাথমিক যুগে ভরের আপেক্ষিক বৃদ্ধিকে যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে দেখা হয়েছিল। আজকের পদার্থবিজ্ঞানীদের অনেকেই ভরের আপেক্ষিকতাকে ঐভাবে স্বীকার করতে চান না। এর কারণও রয়েছে। সেই কারণ অনুসন্ধানই এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা যে বেগে চলাফেরা করি তাতে বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের প্রয়োগ নেই বললেই চলে। নিউটনীয় গতিবিদ্যা দিয়েই আমরা গতিসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় হিসাব নিকাশগুলো করে নিতে পারি। অপরদিকে পারমাণবিক কণাগুলোর গতি আলোর বেগের কাছাকাছি হওয়ায় এদের ক্ষেত্রে তত্ত্বটির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। পদার্থবিদ্যার যে শাখা কণা সম্পর্কিত সকল কিছু নিয়ে আলোচনা করে তাকে বলা হয় কণা পদার্থবিদ্যা। কণা পদার্থবিদ্যা গঠিত হওয়ার পর ভরের আপেক্ষিক বৃদ্ধির অসাড়তা আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হয়েছে। আমরা জানি, ইলেকট্রনের ভর সমগ্র পরমাণুর ভরের তুলনায় একেবারেই নগণ্য এবং এই ভর কোনক্রমেই পর্যবেক্ষকের আপেক্ষিক গতির ওপর নির্ভর করতে পারে না। একজন তার নিজস্ব কাঠামো থেকে ইলেকট্রনের এক রকমের ভর মাপলো, আবার আরেকজন ভিন্ন একটি কাঠামো থেকে সেই ইলেকট্রনের আরেকরকম ভর মাপলো-সেটা তো হতে পারে না। প্রতিটা ইলেকট্রনের ভর ০.০০০৫১১ গিগাভোল্ট/আলোর বেগ২ অপরিবর্তিত থাকে। গতিশীল বস্তুর শক্তির পরিবর্তনকে ভরের পরিবর্তনরূপে দেখা হয় যেটা আসলে এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
আইনস্টাইনের বিখ্যাত ভর-শক্তি সমীকরণটি (শক্তি = ভর × আলোর বেগ২) স্থির বস্তুর শক্তি নির্দেশ করছে, যেখানে ভর = স্থির ভর। গতিশীল বস্তুর ক্ষেত্রে শক্তি আপেক্ষিকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং স্থির শক্তির (ভর × আলোর বেগ২) তুলনায় বেড়ে যায়। কিন্তু এখানে একটা সমস্যা আছে। যেহেতু আলোর বেগ ধ্রুব, সেহেতু ভর না বাড়লে শক্তি কীভাবে বাড়বে এবং সেই শক্তি আবার স্থির শক্তির তুলনায় বেশি হবে? গতিশীল বস্তুর ভর না বাড়িয়েও শক্তি বাড়ানো যায় এবং সেটা করা হয় বস্তুর গতিশক্তির মাধ্যমে। এই শক্তি ভর থেকে নয়, আসে গতি থেকে। সুতরাং উপরের সমীকরণে অপরিবর্তনশীল ভরের সাথে যেভাবেই হোক বেগকেও অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। পদার্থবিজ্ঞানে ভরবেগ নামক একটি রাশি আছে। ভরকে বেগের সাথে গুণ করে এই রাশি পাওয়া যায়। দেখানো যায়, গতিশীল বস্তুর ভর অপরিবর্তিত রাখলে গতিশক্তি ভরবেগের বর্গের সমানুপাতে পরিবর্তিত হয়। অর্থাৎ ভরের কোন পরিবর্তন না করে শুধুমাত্র বেগ বাড়িয়ে ভরবেগ বাড়ানো যায় এবং এর ফলে বস্তুর গতিশক্তিও বেড়ে যাবে। এই গতিশক্তিই বস্তুর মোট শক্তি বৃদ্ধিতে মূল ভূমিকা পালন করে। যেহেতু বেগ আপেক্ষিক, তাই ভরবেগও আপেক্ষিক হবে। বস্তু স্থির থাকলে বেগ শূন্য হওয়ায় ভরবেগও শূন্য হবে। তবে ভরবেগ শূন্য হওয়ার অর্থ এই না যে ভরও শূন্য হতে হবে। ভর শূন্য হলে সেটা কখনই স্থিরতায় আসবে না, আলোর ক্ষেত্রে যেটা হয়ে থাকে। দেখা যাচ্ছে, গতিশীল বস্তুর বেগ থাকলেও ভর শূন্য হতে পারে। কিন্তু ভর শূন্য হলে তো ভরবেগও শূন্য হওয়ার কথা। তাহলে ভরহীন আলোর ভরবেগ থাকে কী করে? এমতাবস্থায় আলোচনায় চলে আসবে কোয়ান্টাম তত্ত্ব। কোয়ান্টাম বলবিদ্যা থেকে দেখানো যায়, কোন কণার ভরবেগ এর সাথে সম্পর্কিত তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সাথে ব্যস্তানুপাতিক (ধ্রুবক হিসেবে থাকে প্ল্যাঙ্ক ধ্রুবক)। মৌলিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ফোটন যেহেতু কোয়ান্টাম কণা এবং কণা-তরঙ্গ দ্বৈতবাদের সাপেক্ষে ফোটন কণার সাথে তরঙ্গ জড়িত, সেহেতু আলোর ভরবেগকে তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সাথে তুলনা করলে ফোটনের ভরবেগ নিয়ে আর মাথাব্যাথা থাকে না। বলা হয় আইনস্টাইন নিজে কখনও গতির কারণে ভরের বৃদ্ধিকে নির্দেশ করেননি, বরং তিনি যখন এ ধরনের কিছু দেখাতে চেয়েছেন তখন সেটাকে শক্তি উপাদানের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। লুইস, পাউলি, এডিংটন ও ম্যাক্স বর্ন এর মাধ্যমে আপেক্ষিক ভরের বিষয়টি পুরোপুরি আপেক্ষিকতার আলোচনায় ঢুকে যায়। এমনকি স্টিফেন হকিং ও রিচার্ড ফাইনম্যানের মতো পদার্থবিদরাও তাঁদের বইতে আপেক্ষিক ভরের ধারণা ব্যবহার করেছেন।