সাবান ভার্সেস হ্যান্ড স্যানিটাইজার- যুদ্ধটা যখন করোনার বিরূদ্ধে

সেই সহস্র বছর আগের আবিষ্কার সাবান, এখনো ব্যবহৃত হচ্ছে দৈনন্দিন জীবনে। সাধারণত সাবানের বিজ্ঞাপনে সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি বা ত্বক কোমল রাখার প্রতি জোর দেয়া হলেও, জীবাণুমুক্ত করতে সাবানের জুড়ি নেই। বিশ্বাস না হলেও সত্য, তুলনামূলকভাবে বাজারে বিক্রি হওয়া এলকোহল সমৃদ্ধ হ্যান্ড স্যানিটাইজারের তুলনায় সাবানই বেশি কার্যকরী।

বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের বিস্তৃতির সাথে সাথে, কোভিড-১৯ সংক্রমণ এড়াতে হাত পরিষ্কার রাখাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। যার ফলে শুরু হয়েছে, হ্যান্ড স্যানিটাইজার কেনার অসুস্থ প্রতিযোগিতা। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দাম। অথচ দামী হ্যান্ড স্যানিটাইজার নয়- সাধারণ সাবানই যথেষ্ট হাত জীবাণুমুক্ত করার জন্য।

একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর বইয়ে হাজারী- নাগের বর্ননায় সাবান বা ডিটারজেন্টের রাসায়নিক গঠন মনে আছে কী? একটু সহজ করে মনে করিয়ে দেই, সাবানের অণুগুলো হলো পিনের মতো। এই পিনের মাথা হচ্ছে হাইড্রোফিলিক বা পানির প্রতি আকর্ষী। আর পিনের লেজ হল ঠিক বিপরীত, পানিকে নয় বরং তেল-চর্বিকে আকর্ষণ করে। যার কারণে, আপনি তেল-চর্বি যুক্ত হাত যখন সাবান দিয়ে ধুতে থাকেন, তখন প্রকৃতপক্ষে, সাবানের পিনের মতো মলিকুলগুলোর লেজে হাতের তেল-চর্বিগুলো লেগে যায়। আর পিনের মত মলিকুলের পানি আকর্ষী মাথাগুলো ফেনা তৈরি করে। একারণেই বলা হয়, যত বেশি ফেনা, তত বেশী পরিষ্কার!

কোভিড-১৯ রোগের জন্য দায়ী করোনা ভাইরাস হচ্ছে লিপিড আবরণী সম্বলিত ভাইরাস। লিপিড হচ্ছে সহজ বাংলায় চর্বি বা তেলেরই এক রূপ। লিপিড আবরণী সম্পন্ন ভাইরাস কিন্তু আমাদের অনেক পরিচিত ভাইরাস। এরকম লিপিড আবরণী দেয়া ভাইরাসের মধ্যেই রয়েছে এইচআইভি, ইবোলা, হার্পিস, ডেঙ্গুর মত অনেক পরিচিত ভাইরাসও। ভাইরাস নিয়ে জানতে আগ্রহী হলে দেখতে পারেন এই সিরিজের লিখাগুলো।

যেটা বলছিলাম, তো এই লিপিড আবরণী মূলতঃ ভাইরাসকে প্রাণীকোষ আক্রমণে সাহায্য করে। আর আগেই বলেছি, সাবান কীভাবে তেল চর্বি পরিষ্কার করে। অনেকটা সেইভাবেই, সাবান ভাইরাসের লিপিড আবরণিকে ছিড়ে ফেলতে পারে।  আপনি যখন সাবান দিয়ে হাত ধুবেন, তখন মূলতঃ আপনার হাতে লেগে থাকা ভাইরাস- ব্যাক্টেরিয়া যা আছে, সবকিছুর চারিদিকে একটি সাবানের পিনের মত মলিকুলগুলো দিয়ে আবরণ তৈরি করবেন। সাবান মলিকুলের লেজগুলো হাতে লেগে থাকা জীবানূর লিপিড আবরণীকে চূর্ণ বিচূর্ন করে দিবে। আর ফেনার সাথে ময়লার মতো করে ধুয়ে নিবে জীবাণুর সবকিছু।

খেয়াল করুন, যে কোনো সাধারণ সাবানই কিন্তু হাতের সব জীবাণুকে একেবারে নষ্ট করে দিতে পারছে। এই জন্য সাবানে বাড়তি কোনো জীবাণু প্রতিরোধী উপাদান একদমই দরকার হচ্ছে না। কাপড় ধোয়ার ডিটারজেন্ট থেকে শুরু করে সবসময়ের জন্য ব্যবহার করা যে কোনো গ্রেডের টয়লেট সোপ একই ভূমিকা পালন করে।

নিঃসন্দেহে প্রায় ৬০ শতাংশ ইথানল সমৃদ্ধ হ্যান্ড স্যানিটাইজারও জীবাণুর গঠন নষ্ট করতে পারে। পার্থক্যটা হলো, হ্যান্ড স্যানিটাইজারে জীবাণুর ছিন্ন বিচ্ছিন্ন অংশ কিন্তু ত্বকের সাথেই থেকে যাচ্ছে। সাবানে যেমন পানির সাথে ধুয়ে চলে যাচ্ছে, সেরকম হচ্ছে না কিন্তু। তাই, এক্ষেত্রে কম দামী সাবানই বাড়তি পয়েন্ট পাচ্ছে।

আমরা আমাদের অজান্তেই নাকে-মুখে হাত দেই, চোখ স্পর্শ করি। তাই, ঘন ঘন হাত ধোয়াকে প্রাধান্য দিতে হবে। সাবান দিয়ে কীভাবে হাত ধুবেন, তা বারবার টিভি-পত্রিকায় বলা হচ্ছে। অন্তত ২০ সেকেন্ড সময় নিয়ে হাতের দুই পাশ কব্জিসহ ভালো করে ধুতে হবে। বোম্বাই মরিচ হাতে নিলে যেরকম ঘষেমেজে ধুতে হয়, একদম সেভাবে! হাঁচি কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা, যেখানে সেখানে থুথু-কফ না ফেলা, আর সৌজন্যমূলক দূরত্ব বজায় রেখে মানুষের সাথে কথা বলার মত স্বাভাবিক ভদ্রতা চর্চাগুলোকে আয়ত্ত্বে নিয়ে আসার এখনই সময়।

Comments

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
জানান আমাকে যখন আসবে -
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x