পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উৎপত্তিঃ সে এক মহাকাব্য!

কী চমৎকার এই পৃথিবী! কী অপরুপ এর সৌন্দর্য! পাশাপাশি, প্রাণ বলতে আজ আমরা যা বুঝি, সেই প্রাণের জন্য কত উপযুক্ত আমাদের এই গ্রহ! প্রাণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এই গ্রহের সবখানে। আজ আমরা চাইলেই বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছি। বাইরে গিয়ে দাঁড়ালে শুক্র বা ভেনাস গ্রহের মত পুড়ে যেতে হচ্ছে না, আবার ইউরেনাসের মত জমে যেতে হচ্ছে না। চোখ তুলে ওপরে তাকালেই দেখছি সুবিশাল নীল আকাশ!

এই পৃথিবী সবসময় এমন ছিলো না কিন্তু! চাইলেই বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারতেন না, কারণ বাতাসে এত অক্সিজেন ছিলো না। পৃথিবীর ইতিহাসে একটা সময় এত উত্তপ্ত ছিলো যে ভূ-পৃষ্ঠের ওপর দাঁড়ানো যেত না। আবার একটা সময় এত শীতল ছিলো যে খোলা মাঠে দাঁড়ালে রক্ত-মাংস জমে যেতোই। আর এই গ্রহের প্রাণের সমারোহের ছিঁটেফোঁটাও ছিলো না তখন। আর এই সুবিশাল নীল আকাশ? এটার রঙও একসময় নীল নয়, বরং কমলা রঙের ছিলো। এই সবকিছুই আজকের অবস্থায় এসেছে বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তনের হাত ধরে। তাই, আমাদের আজকের পরিস্থিতি বুঝতে হলে জানতে হবে আমাদের বায়ুমণ্ডলের ইতিহাস।

এখন আমাদের বায়ুমণ্ডলে আছে প্রায় ৭৮% নাইট্রোজেন, ২১% অক্সিজেন, .৯৩% আর্গন, ০.০৪% কার্বন, এবং অত্যন্ত সামান্য পরিমাণে হাইড্রোজেন আর জলীয়বাষ্প। কিন্তু আমরা বায়ুমণ্ডলকে এই অবস্থায় পেয়েছি অনেক ঝড় ঝাপ্টার মধ্য দিয়ে। আক্ষরিক অর্থেই, প্রচুর ঝড় ঝাপ্টা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্য দিয়ে।

প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে, যখন শিলা আর ধূলিকণার দলা থেকে আমাদের সৌরজগত তৈরি হচ্ছিলো, তখনকার অবস্থা আমাদের সময়কার কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের উদাহরণ দিয়েই বোঝানো যাবে না। মহাকর্ষের টানে মহাজাগতিক বস্তুগুলো একত্রিত হতে হতে গ্রহ, উপগ্রহ, আর গ্রহাণুতে পরিণত হচ্ছিলো। একের পর এক সংঘর্ষে অনেক কিছুই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিলো, আবার জড়ো হচ্ছিলো মহাকর্ষের টানে। পৃথিবীর উৎপত্তিও সেই সময়েই।

আমাদের সূর্য মূলত হাইড্রোজেন দিয়ে তৈরি। আর পৃথিবী আর সূর্য যেহেতু একই নীহারিকা বা ধূলিকণার মেঘ থেকে পুঞ্জীভূত হয়েছে, পৃথিবীর প্রাথমিক বায়ুমণ্ডলেও সবচেয়ে বেশি ছিলো হাইড্রোজেন। বিরামহীন সংঘর্ষগুলোর মাধ্যমে অবশ্য জলীয়বাষ্প, মিথেন, আর এমোনিয়া নির্গত হচ্ছিলো। জলীয়বাষ্পের পরিমাণই বেশি ছিলো, কারণ উল্কাপিণ্ডগুলোতে প্রচুর পরিমাণে পানি ছিলো। যখন প্রাথমিক সংঘর্ষগুলো একটু ঝিমিয়ে এলো, তখন সৌরঝড়ের কারণে হাইড্রোজেনের মত হাল্কা গ্যাসগুলো মহাকর্ষের বাধা ছিন্ন করে মহাশূন্যে হারিয়ে গেলো। কিন্তু কিছুটা ভারী হবার কারণে জলীয়বাষ্পসহ অন্যান্য গ্যাসগুলো আটকে গেলো। পুরো পৃথিবীর চারপাশে তৈরি হলো জলীয়বাষ্পের স্তর। এগুলোই আস্তে আস্তে তৈরি করলো মহাসাগর।

ভূ-পৃষ্ঠ আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা হচ্ছিলো, তবু ভূ-পৃষ্ঠের নিচে যেহেতু তখনো উত্তপ্ত লাভা, তাই ভূ-পৃষ্ঠের সবখানে তখন অনেক অনেক আগ্নেয়গিরি। অগ্ন্যুৎপাতের সাথে লাভাগুলো বেরিয়ে আসছিলো, পাশাপাশি নির্গত হচ্ছিলো নাইট্রোজেন, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, আর কিছু নিষ্ক্রিয় গ্যাস। মহাসাগরের পানির মধ্যে প্রচুর পরিমাণে কার্বন-ডাই-অক্সাইড দ্রবীভূত হয়ে গেলো। বায়ুমণ্ডলের নতুন রাজা হয়ে দাঁড়ালো নাইট্রোজেন। সে প্রায় ৩৫০ কোটি বছর আগের কথা। এবং সেই রাজত্ব এখনো চলছে।

অবশ্য তখনো বাতাসে তেমন কোনো মুক্ত অক্সিজেন ছিলো না বললেই চলে। প্রাণের অস্তিত্বের জন্য অক্সিজেন জরুরি, কিন্তু শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও সত্যি, এই বিপুল পরিমাণ অক্সিজেন প্রাণই তৈরি করে নিয়েছে। সব ধরনের প্রাণের জন্য আসলে অক্সিজেন লাগে না। মহাসগরের গভীরে কিছু আগ্নেয়গিরি ছিলো, খুব সম্ভবত সেখানেই প্রথমবারের মত আনুবীক্ষণিক জীবের জন্ম হয়েছিলো। ওদের অক্সিজেন লাগতো না, উল্টো অতিরিক্ত অক্সিজেন এদের জন্য ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হবে, যা আমরা কিছুক্ষণ পরেই দেখবো। যাই হোক, এরা হাইড্রোজেন ব্যবহার করতে পারতো, এবং বর্জ্য হিসেবে মিথেন ছড়াতো। প্রাণের সাথে বায়ুমণ্ডলের আদান-প্রদান শুরু হয়ে গেলো কিন্তু। তবে এই আদান-প্রদানের প্রভাব শক্তিশালী হতে লেগে যাবে আরো অনেক অনেক বছর।

এমন সময়ে বায়ুমণ্ডলে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আরেকটা স্তর তৈরি হলো – ওযোন স্তর। সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মির প্রভাবে পানির অণুগুলো হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন পরমাণুতে ভেঙে যাচ্ছিলো। অক্সিজেন পরমাণুগুলো অক্সিজেন অণুর বদলে ওযোন অণুতে পরিণত হয়ে ভূ-পৃষ্ঠের ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার ওপরে একটা স্তর তৈরি করলো। পরবর্তী প্রাণের জন্য এই স্তর ছাতা হিসেবে কাজ করবে, সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মির হাত থেকে এরাই ওদেরকে বাঁচাবে। এই ওযোন স্তর তৈরি হবার আগে সকল প্রাণই ছিলো সাগরের তলদেশে। কিন্তু ওযোন স্তর তৈরি হবার পর, প্রাণ সাগরের পৃষ্ঠে উঠে আসা শুরু করলো। এখন পৃথিবী এমন কিছু ব্যাক্টেরিয়ার জন্য প্রস্তুত, যারা সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে শর্করা তৈরি শুরু করতে পারবে। এদের নাম সায়ানোব্যাকটেরিয়া। আমরা এদের কাছে ঋণী। কারণ, এরাই সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে পানিকে ভেঙে, বর্জ্য হিসেবে অক্সিজেন নির্গমনের এমন একটা চলমান প্রক্রিয়া শুরু করেছিলো, যার হাত ধরে আমরা আজ আমাদের উপযুক্ত বায়ুমণ্ডল পেয়েছি। তবে আমরা এখনো সামুদ্রিক অক্সিজেন নিয়ে কথা বলছি। সেই আনুবীক্ষণিক প্রাণের কথা মনে আছে, যারা অক্সিজেন ছাড়াই দিব্যি বেঁচে থাকতে পারতো? অক্সিজেনের এই আধিক্যের ফলে তাদের জন্য নতুন বায়ুমণ্ডল বিষাক্ত হয়ে গেলো, তাদের অনেকেই ধ্বংস হয়ে গেলো।

অক্সিজেনের বৃদ্ধি এবং মিথেন বা কার্বন-ডাই-অক্সাইডের ঘাটতির ফলে পৃথিবীর রুপ একদম পাল্টে গিয়েছিলো। আমরা জানি যে, মিথেন বা কার্বন-ডাই-অক্সাইড হচ্ছে গ্রীনহাউজ গ্যাস, যা তাপ ধরে রাখে। এই গ্রীনহাউজ গ্যাসের ঘাটতির ফলে পৃথিবী একদম শীতল হয়ে গিয়েছিলো ২৪০ কোটি বছর আগে। সে যাত্রা পৃথিবীকে রক্ষা করেছিলো কে, জানেন? আগ্নেয়গিরি! বরফে ঢেকে যাওয়া পৃথিবীর পৃষ্ঠ ভেদ করে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিলো বেশ কিছু আগ্নেয়গিরি। আবারো অনেক গ্রীনহাউজ গাস ছড়িয়ে দিয়েছিলো বায়ুমণ্ডলে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলো, বরফ গলে গেলো, আবারো তরল মহাসাগর উঁকি দিলো। বিজ্ঞানীরা বলেন, ২০ কোটি বছরের মধ্যে পৃথিবীকে তিনবার এই শীতলীকরণ আর উষ্ণায়নের চক্র দিয়ে যেতে হয়েছে। এর পরেও অবশ্য শীতলীকরণের বেশ কিছু ধাপ ছিলো, যেগুলোকে আমরা Ice Age বলি। তবে সেটার পেছনে মূল কারণ ছিলো পৃথিবীর আবর্তন। তবে আজ আমরা সেটা নিয়ে কথা বলছি না। সেই আইস এজেও আর পুরো পৃথিবীকে একসাথে জমে যেতে হয়নি। কার্বন-ডাই-অক্সাইড এমন একটা অবস্থায় পৌঁছেছিলো, যা পৃথিবীতে তরল পানির উপস্থিতি নিশ্চিত করেছিলো।

আলোচনায় ফিরে আসি — ৩০০ কোটি বছর আগে সমুদ্রের অক্সিজেনের পরিমাণ ছিলো ০.১%। প্রায় ২০০ কোটি বছর পর, অর্থাৎ আজ থেকে ৮০ কোটি বছর আগে সমুদ্রের অক্সিজেনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ালো ১ কি ২% এর কাছাকাছি। অর্থাৎ, ১০০ থেকে ২০০ গুণ বেড়ে গেলো অক্সিজেন। আর ইডিয়াকারান (Ediacaran) যুগের শেষে, প্রায় ৫৫ কোটি বছর আগে, আরো একবার সামুদ্রিক অক্সিজেন বেশ অনেকটুকু বেড়ে গিয়েছিলো।

৫৪ কোটি বছর আগে, প্রাণের ব্যাপক বিস্তার ঘটলো। পৃথিবীর সমুদ্র উপভোগ করলো প্রাণের ব্যাপক বিস্ফোরণ। সেই সময়টাকে আমরা বলি ক্যাম্ব্রিয়ান যুগ। এই সময়ে প্রাণের বিস্ফোরণের সাথে অক্সিজেনের বৃদ্ধির সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। কারণ, এর আগে বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেনের পরিমাণ তখনো অত্যন্ত কম ছিলো। কারণ, ব্যাকটেরিয়ার সালোকসংশ্লেষণে যে অক্সিজেন উৎপন্ন হতো, সেটা লোহা এবং লোহাজাতীয় অন্যান্য পদার্থকে জারিত করতেই চলে যেত। ক্যাম্ব্রিয়ান যুগ শুরু হবার ঠিক আগের দিকে, বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেনের পরিমাণ ১৫% এর দিকে এসে ঠেকেছিলো। ঐ সময়ের কাছাকাছি আকাশের রঙ নীল দেখা যেতে শুরু করলো। এমনিতে কিন্তু আকাশের নিজের কোনো রঙ নেই। আকাশ বলতে আমরা যা বুঝাই, সেটা মূলত পৃথিবীর উপরের বায়ুমণ্ডলটুকুই। সূর্যের আলো বায়ুমণ্ডল ভেদ করে পৃথিবীর ওপর এসে পড়ে। সেসময় বায়ুতে থাকা বিভিন্ন গ্যাসের কণার সাথে আলোর রশ্মিগুলো ধাক্কা খায়। অক্সিজেন বা নাইট্রোজেনে ভরপুর বায়ুমণ্ডল হওয়ার আগে সূর্যের আলো এই পাতলা স্তর পেরিয়ে সরাসরি এসে পড়তো। তার রশ্মিগুলোকে ধাক্কা দেয়ার মতো কণার পরিমাণ কম ছিল। তাই তখনকার “আকাশ” ছিলো কমলাটে। কিন্তু আমাদের ঘন বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে সূর্যের আলো আসার সময় রশ্মিগুলো অক্সিজেন ও নাইট্রোজেনের কণার সাথে ক্রমাগত ধাক্কা খেতে থাকে। আলোর রশ্মির এই ধাক্কা খাওয়ার ঘটনাকে পদার্থবিজ্ঞানীরা বলেন বিচ্ছুরণ ও বিক্ষেপন। এজন্যই আমরা আমাদের আকাশকে নীল দেখি।

যাকগে, আবার আলোচনায় ফিরে আসি। এই জায়গায় এসে আপনার হয়তো মনে হচ্ছে, এখান থেকে বাড়তে বাড়তেই হয়তো আজকের ২১% এ এসে থেমেছে। আসলে কিন্তু ২৮ কোটি বছর আগে, অক্সিজেন বাড়তে বাড়তে ৩০% পর্যন্ত চলে গিয়েছিলো। কারণ ততদিনে বড় বড় উদ্ভিদ পৃথিবীতে রাজত্ব শুরু করেছিলো। সময়ের সাথে সাথে ধীরে ধীরে সেটা আবার কমে এসেছে, খুব সম্ভবত বাড়তে থাকা প্রাণবৈচিত্র্যের সাথে মিথস্ক্রিয়ার ফলেই। তবু নাইট্রোজেনের পরে বায়ুমণ্ডলের দ্বিতীয় স্থান এখনো অক্সিজেনেরই দখলে।

আমরা যে যুগে বাস করছি, সেখানে অনেকদিন ধরে বায়ুমণ্ডলে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। তবে আমরা মানুষেরাই ধীরে ধীরে পরিবর্তন ঘটাচ্ছি।

তাপমাত্রার পরিবর্তনের গ্রাফটা দেখতে হকি স্টিকের মত। তাই এটাকে হকি স্টিক ইফেক্টও বলা হয়।

গত ২০০০ বছরের তাপমাত্রার চার্ট দেখলে খুব উল্লেখযোগ্য একটা পরিবর্তন দেখা যায়। শিল্পায়নের যুগ শুরু হবার পর থেকেই আমরা অত্যন্ত দ্রুত হারে বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ছড়াচ্ছি। আর এই কার্বন ডাই অক্সাইড আমাদের বায়ুমণ্ডলকে উত্তপ্ত করে তুলছে, গোটা পৃথিবীটাই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, ঘটছে জলবায়ু পরিবর্তন। আমরা আগেও দেখেছি যে প্রাণের পক্ষে বায়ুমণ্ডলের ব্যাপক পরিবর্তন সম্ভব। আর সকল পরিবর্তনই প্রাণের জন্য ইতিবাচক নয়।

কাছাকাছি বিষয় নিয়ে চমৎকার কিছু ভিডিওর তালিকা করে দিলাম, ওপরে দেয়া ভিডিওটাও চমৎকার। আমি এগুলো থেকে বেশ কিছু তথ্য নিয়েছি।

1) Video 1

2) Video 2

3) Video 3

4) Video 4

5) Video 5

Comments

ফরহাদ হোসেন মাসুম

ফরহাদ হোসেন মাসুম

বিজ্ঞান একটা অন্বেষণ, সত্যের। বিজ্ঞান এক ধরনের চর্চা, সততার। বিজ্ঞান একটা শপথ, না জেনেই কিছু না বলার। সেই অন্বেষণ, চর্চা, আর শপথ মনে রাখতে চাই সবসময়।

আপনার আরো পছন্দ হতে পারে...

মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানান

সবার আগে মন্তব্য করুন!

জানান আমাকে যখন আসবে -
avatar
wpDiscuz